সংবিধান দিবসের দিন ফের গণতন্ত্র রক্ষার বার্তা দিলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বুধবার কলকাতায় বাবা সাহেব আম্বেদকরের মূর্তিতে শ্রদ্ধা জানাতে এসে কেন্দ্র ও বিজেপির বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ উগরে দেন তিনি। সংবিধান হাতে নিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়ে সংবিধান প্রণেতার আদর্শের নিরপেক্ষতা, সাম্য ও সমতার খসড়া পড়েও শোনান মুখ্যমন্ত্রী যা এদিনের কর্মসূচিকে এক বিশেষ তাৎপর্য দেয়।
এদিন বক্তব্য রাখতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী জানান, সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত একটি খবরে চোখ পড়েছে তাঁর যেখানে দাবি করা হয়েছে, সংসদে ‘জয় হিন্দ’ বা ‘বন্দে মাতরম’ স্লোগান উচ্চারণ করা যাবে না। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “সত্য-মিথ্যা জানি না, তবে খোঁজ নেব।” তবে এরপরই তাঁর কণ্ঠে ভেসে ওঠে তীব্র প্রতিবাদের সুর। তিনি বলেন, “বন্দে মাতরম তো জাতীয় সঙ্গীত! তাহলে কি বাংলার পরিচয় মুছে দিতে চাইছে বিজেপি? বাংলা তো ভারতের বাইরে নয়। ক্ষমতায় আছে বলে বিজেপি যা খুশি করবে, তা বরদাস্ত করা হবে না।”
এদিন স্পষ্ট ভাষায় মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করেন, “যেকোনও মূল্যে গণতন্ত্র রক্ষা করব। দেশ যে বীর স্বাধীনতা সংগ্রামীরা গড়েছেন, তাঁদের আদর্শ আমরা মানি। তাঁদের গাইডলাইন মানব, বিজেপির নয়।“ এরই সঙ্গে অভিযোগ তোলেন, দেশে মানুষের ভোটাধিকার ও ধর্মীয় অধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। তপশিলি, দলিত, সংখ্যালঘু এমনকি সাধারণ হিন্দু ভোটারদেরও বাদ দেওয়া হচ্ছে না ‘কুৎসিত ভাষার আক্রমণ’ থেকে এমনই মন্তব্য করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
নাগরিকত্বের প্রমাণ চাওয়া নিয়েও তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি। SIR প্রক্রিয়ার প্রসঙ্গ টেনে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “যাঁরা বছরের পর বছর দেশের মাটিকে লালন করেছেন, তাঁদের কাছে আজ দেশে থাকার প্রমাণ চাওয়া হচ্ছে! নাগরিক অধিকারের নাম করে আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে।”
এদিন বক্তব্যে উঠে আসে মুখ্যমন্ত্রীর বনগাঁ সীমান্ত সফরের অভিজ্ঞতাও। মঙ্গলবার সীমান্তবাসীর দুর্দশা দেখতে বনগাঁয় গিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। সেখানকার মানুষের কান্না ও যন্ত্রণার ছবি তুলে ধরে তাঁর মন্তব্য, “মানুষ বুকের কান্নায় ভেঙে পড়ছে, যারা এটা নিয়ে রাজনীতি করছে তারা দেশকে লজ্জায় ফেলছে। এদের ধিক্কার জানাই।”
মোদী–শাহকে খোঁচা দিয়ে ‘বাবুমশাই’ সম্বোধন করে তিনি আরো বলেন, “BLO-দের ফোনে হুমকি দিচ্ছে, বলছে চাকরি কেড়ে নেবে! সার্ভার কাজ করছে না, আপলোড করতে পারছে না, অথচ চাপ বাড়ানো হচ্ছে।” কমিশনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “শুধু বাংলা নয়, গোটা দেশে ওই প্রক্রিয়া চালাতে গিয়ে BLO–দের মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। কমিশনের মুখে তালা কেন?”
BLO–দের দাবি ‘ন্যায্য’ উল্লেখ করে সিইও অফিস সাপেক্ষেও আক্রমণ শানান তিনি। তাঁর অভিযোগ, “৪৮ ঘণ্টা বসে থাকতে হল নিজেদের দাবি জানাতে! কতটা নির্মম হলে এমন করা যায়?” নিজের মানবিক আচরণের উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, “রাস্তার বিক্ষোভ দেখেই আমি দাঁড়িয়ে মানুষের অভিযোগ শুনি। তাহলে ওদের অহঙ্কার কেন? বলছে—৪ জনের বেশি দেখা করবে না!”
শেষপর্বে মুখ্যমন্ত্রী হুঁশিয়ারি দেন, “৪ কোটি লোক মেশান, তবু বাংলা লড়ে নেবে। SIR–এর নামে পিছনের দরজা দিয়ে বাংলা দখলের চেষ্টা চলছে।” একইসঙ্গে তাচ্ছিল্যের সুরে তিনি বলেন, “ঝুট আর লুট—ভোটের আগে ১০ হাজার দাও, ভোটের পর সব লুটে নাও—এটাই কি বিজেপির নীতি?”
মুখ্যমন্ত্রীর ভাষণে এদিন রাজনৈতিক উত্তাপ, নাগরিক অধিকার বিতর্ক ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ রক্ষার দৃঢ় অঙ্গীকার—সব মিলিয়ে রাজ্য–রাজনীতির ময়দান সরগরম হয়ে ওঠে।
