গোটা ভূ-ভারতে আর কোথাও এমন অদ্ভুত নিয়ম নেই। কেরল বলুন, মেঘালয় বলুন, রাজস্থান কিংবা মধ্যভারতের যে কোনও অংশ- অবলীলায় একই গাড়ি নিয়ে ঘুরে বেড়ানো যায় রাজ্যের যে কোনও প্রান্তে। কোনও কোনও জায়গায় তো অন্য জায়গার গাড়িও চলে যাচ্ছে পারমিট থাকলে। ব্যতিক্রম শুধু বাংলা, আরও স্পষ্ট করে বললে দার্জিলিং পাহাড়। আশ্চর্যের বিষয়, প্রায় এক মাস ধরে কার্যত অচলাবস্থা চললেও রাজ্য সরকারের সদর্থক কোনও ভূমিকা চোখে পড়ছে না। স্থানীয় প্রশাসনের ওপরই সবটা চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু হুমকি-পালটা হুমকিতে পরিস্থিতি যেদিকে এগোচ্ছে, তাতে এর স্থায়ী সমাধান করা স্থানীয় প্রশাসনের হাতের বাইরে। ফলে এটা শুধু আর প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, বরং বৃহত্তর অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকটেরও ইঙ্গিত দিচ্স্ট যখন মাথাচাড়া দিয়েছে, তখন দুয়ারে কড়া নাড়ছে বড়দিন ও নববর্ষ। প্রতিবার এই সময় পাহাড় কার্যত পর্যটকের ভিড়ে ঠাসা থাকে। এমন একটা সময় চালকদের এই দ্বন্দ্ব ভুল বার্তা দিচ্ছে পর্যটনমহলে। পরিবার, পরিজন নিয়ে বেড়াতে এসে যদি হেনস্তার শিকার হতে হয়, এই ভেবে মুখ ফেরাচ্ছেন পর্যটকরা। অনেকেই হয়তো ভাবছেন, এক মরশুমে ব্যবসা মাটি হলে আর কী এসে যায়! পরের মরশুমে পুষিয়ে নেওয়া যাবে। গলদটা এখানেই। ভিনরাজ্যের এজেন্টরা কিন্তু এখন থেকেই মুখ ফেরাতে শুরু করেছেন। সুতরাং এর প্রভাব যে দীর্ঘমেয়াদি হবে, তা নতুন করে বলার নয়।
পাহাড় ও সমতলের এই পরিবহণ সংকটের মূলে উঠে আসছে ‘সিন্ডিকেটরাজ’ এবং এলাকা দখলের লড়াই। সমতলের চালকদের অভিযোগ, পাহাড়ের নির্দিষ্ট কিছু পয়েন্টে তাদের গাড়ি দাঁড় করাতে দেওয়া হচ্ছে না কিংবা যাত্রী তুলতে বাধা দেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে, পাহাড়ের চালক ও সংগঠনগুলোর যুক্তি, বাইরের গাড়ি পাহাড়ের সংকীর্ণ রাস্তায় যত্রতত্র পার্কিং ও যাত্রী পরিবহণ করলে স্থানীয় চালকদের রুটিরুজিতে টান পড়ছে। এই একচেটিয়া আধিপত্য কায়েম করার লড়াইয়ে সাধারণ মানুষ আজ দিশেহারা। দার্জিলিং, কালিম্পং বা কার্সিয়াং থেকে শিলিগুড়িতে চিকিৎসার জন্য আসা রোগী হোক কিংবা সমতল থেকে পাহাড়ে বেড়াতে যাওয়া পর্যটক- প্রত্যেকেই কোনও না কোনওভাবে এই টানাপোড়েনের শিকার। মাঝরাস্তায় পর্যটকদের গাড়ি থেকে নামিয়ে দেওয়া কিংবা স্ট্যান্ডে গাড়ি ঢুকতে না দেওয়ার মতো ঘটনাগুলো যেভাবে সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে ছড়াচ্ছে, তাতে আন্তর্জাতিক পর্যটন মানচিত্রে দার্জিলিংয়ের ভাবমূর্তি কালিমালিপ্ত হচ্ছে।
সিকিম বা মেঘালয়ের মতো প্রতিবেশী রাজ্যগুলো যখন পর্যটনের প্রসারে পরিকাঠামো উন্নত করছে, নতুন নতুন পরিকল্পনা নিচ্ছে, তখন এখানকার গাড়িচালকদের একাংশ এলাকা দখলের লড়াইয়ে মেতে। আজ টাইগার হিল যাব না, কাল অমুক জায়গায় যাব না এসব করতে গিয়ে আদতে নিজেদের ভাতের থালা নিজেরাই ফুটো করছে। এদের প্রত্যেকেরই মনে রাখা উচিত, পর্যটনশিল্পের কোমর যদি একবার ভেঙে যায়, তবে তার প্রভাব কিন্তু শুধু পাহাড়ের চালকদের ওপর নয়, হোটেল, রেস্তোরাঁ ও অন্য ব্যবসার ওপরও পড়বে।
পাহাড়-সমতলের এই সমস্যা মেটাতে রাজ্য প্রশাসনের যে ধরনের সক্রিয়তা দেখানো উচিত ছিল, তার বিন্দুমাত্র চোখে পড়েনি। পুলিশ ও পরিবহণ দপ্তর মাঝেমধ্যে বৈঠক ডাকলেও তা ফলপ্রসূ হচ্ছে না। রাজ্য সরকারের হয়ে শিলিগুড়ির মেয়র গৌতম দেব মধ্যস্থতা করছেন ঠিকই। কিন্তু পাহাড়ের চালকরা তাঁর কথা শুনবেন কেন! আরও একটা প্রশ্ন খুব জোরালো হচ্ছে চারদিকে- এই একই ধরনের ঘটনা যদি কলকাতা কিংবা দক্ষিণবঙ্গের অন্য কোথাও ঘটনা, রাজ্য সরকার কি এই নরমপন্থাই নিত? উত্তরটা খুব স্বাভাবিকভাবেই না।
আসল সমস্যাটা হচ্ছে, পাহাড়ের জন্য জিটিএ এবং সমতলের জন্য রাজ্য সরকারের পরিবহণ নীতি – এই দুইয়ের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব। কোনও নির্দিষ্ট নিয়ম না থাকায় ইউনিয়নগুলো নিজেদের ইচ্ছেমতো ফতোয়া জারি করছে। আইন অনুযায়ী অল বেঙ্গল পারমিট থাকা সত্ত্বেও কেন একটি গাড়ি নির্দিষ্ট স্ট্যান্ডে ঢুকতে পারবে না, সেই প্রশ্ন তোলা এখন জরুরি। আবার পাহাড়ের সংকীর্ণ রাস্তার ধারণক্ষমতা কতটুকু, সেই তথ্যও প্রশাসনের কাছে থাকা দরকার। পার্কিং সমস্যা মেটাতেও অবিলম্বে উদ্যোগী হওয়া প্রয়োজন প্রশাসনকে। তা না করে খেয়োখেয়ি করলে আসলে তা নিজেদেরই কবর খোঁড়ার সমান।
রাজ্য প্রশাসনের উচিত, পাহাড় ও সমতলের জন্য একটি অভিন্ন পরিবহণ নীতি তৈরি করা। কোন গাড়ি কোথায় যাত্রী নামাবে এবং কোথা থেকে তুলবে, তার ডিজিটাল ম্যাপিংও থাকা প্রয়োজন। পরিবহণ ব্যবস্থাকে পেশিশক্তির হাত থেকে মুক্ত করে পেশাদারিত্বের জায়গায় নিয়ে আসতে হবে। কোনও ইউনিয়ন বা গাড়িচালক যদি যাত্রীদের হয়রান করেন, তবে লাইসেন্স বাতিলের মতো কঠোর পদক্ষেপ করতে হবে।
পাহাড় ও সমতলের দূরত্ব ঘোচাতে সরকার কোটি কোটি টাকা খরচ করে রাস্তা, সেতু বানাচ্ছে ঠিকই। কিন্তু স্বার্থের লড়াই যদি শেষ না হয়, তবে সেই রাস্তা, সেতু কোনও কাজে আসবে না। পরিবহণ ধর্মঘট বা গাড়ি চলাচল বন্ধ করে কেউ কখনও জয়ী হতে পারে না, পারবেও না। দিনশেষে ক্ষতি হবে পাহাড়-সমতলের সহজ-সরল মানুষের এবং সেই সমস্ত মেহনতি চালকদের, যাঁরা প্রতিদিনের রোজগারের ওপর নির্ভরশীল।
মনে রাখতে হবে, এটা কোনও জাতিসত্তার বা এলাকা দখলের লড়াই নয়। এই লড়াই নিজেদের ভাতের স্বার্থে। সুতরাং এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা। তাই সময় এসেছে জেদ ছেড়ে আলোচনার টেবিলে বসার। প্রশাসনকে কঠোর হাতে যেমন অনিয়ম দমন করতে হবে তেমনই ইউনিয়নগুলোকেও বুঝতে হবে যে, পর্যটন এবং জনজীবন স্বাভাবিক না থাকলে তাদের অস্তিত্ব সংকটে পড়বে।দার্জিলিং আমাদের গর্ব। সেই গর্ব যেন সংকীর্ণ স্বার্থের জাঁতাকলে পিষ্ট না হয়, আজকের দিনে এটাই সবচেয়ে বড় দাবি।
