আইডিএফসি ব্যাঙ্কের শাখায় ৫৯০ কোটি টাকার বিশাল জালিয়াতি: যেভাবে ঘটল এই কাণ্ড

আইডিএফসি ফার্স্ট ব্যাংকের (IDFC First Bank) চণ্ডীগড় শাখায় ৫৯০ কোটি টাকার এক চাঞ্চল্যকর জালিয়াতির ঘটনা প্রকাশ পেয়েছে, যা বর্তমানে ভারতের ব্যাংকিং খাতে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এই জালিয়াতির কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল হরিয়ানা রাজ্য সরকারের বেশ কিছু ব্যাংক অ্যাকাউন্ট। গত ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে যখন হরিয়ানা সরকারের একটি বিভাগ তাদের অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে অন্য ব্যাংকে টাকা হস্তান্তরের অনুরোধ জানায়, তখনই প্রথম অসঙ্গতিটি ধরা পড়ে। ব্যাংকের নথিতে থাকা ব্যালেন্সের সাথে সরকারের দাবি করা অংকের বিশাল ফারাক দেখে কর্তৃপক্ষ চমকে ওঠে। প্রাথমিক তদন্তে জানা যায় যে, চণ্ডীগড় শাখার কিছু অসাধু কর্মকর্তা জালিয়াতির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থ সরিয়ে ফেলেছেন।

এই ঘটনার তদন্তে নেমে চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। জানা গেছে, জালিয়াতির মূল মাস্টারমাইন্ড ছিলেন এই শাখারই প্রাক্তন ম্যানেজার ঋভ ঋষি, যিনি পরে অন্য একটি ব্যাংকে যোগ দিয়েছিলেন। তদন্তকারীদের মতে, ঋভ ঋষি এবং তার সহযোগীরা ভুয়া সই, জাল চেক এবং ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ সিস্টেম ম্যানিপুলেট করে ‘মুখ্যমন্ত্রী গ্রামীণ আবাস যোজনা-২.০’ প্রকল্পের বড় অংকের অর্থ বিভিন্ন সেল কোম্পানির (Shell Company) অ্যাকাউন্টে সরিয়ে নেন। এই জালিয়াতিতে ব্যাংকের বর্তমান ও প্রাক্তন চারজন কর্মকর্তা সরাসরি যুক্ত ছিলেন বলে প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া গেছে। বিশেষ করে সেপ্টেম্বর ২০২৫-এ খোলা দুটি অ্যাকাউন্টের ৫০ কোটি টাকার বিপরীতে ব্যাংক যখন মাত্র ১.২৭ কোটি টাকা ফেরত দিতে সক্ষম হয়, তখনই এই প্রতারণার গভীরতা সবার সামনে আসে।

প্রতারণা ফাঁস হওয়ার পর হরিয়ানা সরকার অত্যন্ত কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। মুখ্যমন্ত্রী নায়েব সিং সাইনি বিধানসভায় জানান যে, জালিয়াতির ঘটনার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই ব্যাংক থেকে প্রায় ৫৭৮ কোটি টাকা (সুদসহ আসল) উদ্ধার করে সরকারি কোষাগারে ফেরত আনা হয়েছে। তবে নিরাপত্তার স্বার্থে হরিয়ানা সরকার আইডিএফসি ফার্স্ট ব্যাংক এবং এই ঘটনার সাথে পরোক্ষভাবে যুক্ত অন্য একটি বেসরকারি ব্যাংককে সরকারি লেনদেন থেকে নিষিদ্ধ (De-empanelled) করেছে। এছাড়া রাজ্য জুড়ে সমস্ত সরকারি বিভাগকে বেসরকারি ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নিয়ে সরকারি ব্যাংকে জমা রাখার কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যেই অভিযুক্ত চার কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করেছে এবং পুরো ঘটনার ফরেনসিক অডিট করার জন্য কেপিএমজি (KPMG)-কে নিয়োগ দিয়েছে। এর পাশাপাশি হরিয়ানা পুলিশের ভিজিল্যান্স ব্যুরো প্রধান হোতা ঋভ ঋষিসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে। জালিয়াতির খবর ছড়িয়ে পড়ায় শেয়ার বাজারেও ব্যাংকের দরে বড় ধস নামে, যার ফলে বিনিয়োগকারীদের প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা লোকসান হয়। বর্তমানে পুলিশ খতিয়ে দেখছে যে, এই জালিয়াতির নেটওয়ার্ক আরও বিস্তৃত কি না এবং সরিয়ে নেওয়া বাকি টাকা কোথায় পাচার করা হয়েছে। ভারতের এই সাম্প্রতিক ব্যাংক কেলেঙ্কারিটি আবারও প্রমাণ করল যে, প্রযুক্তির আধুনিকায়ন হলেও অভ্যন্তরীণ নজরদারিতে সামান্য গাফিলতি বড় ধরণের বিপদ ডেকে আনতে পারে।