ভারত ও ব্রিটেনের মধ্যে সম্প্রতি স্বাক্ষরিত শুল্কমুক্ত বাণিজ্যচুক্তি (Free Trade Agreement – FTA) বাংলার ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্পের জন্য এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। বিশেষ করে, পশ্চিমবঙ্গের ঐতিহ্যবাহী কাঠপুতুল শিল্প এই চুক্তির সুবাদে বিলেতের বাজারে প্রবেশ করে ব্যাপক সাফল্য অর্জন করেছে। শুল্কমুক্ত আমদানির সুযোগ পাওয়ায় এখানকার কারিগরদের উৎপাদিত পণ্য এখন ব্রিটিশ বাজারে আরও বেশি প্রতিযোগিতামূলক দামে বিক্রি হচ্ছে, যার ফলে তাদের লক্ষ্মীলাভ হচ্ছে।
নদীয়ার কৃষ্ণনগর, বর্ধমানের কাটোয়া, এবং বাঁকুড়ার বিভিন্ন অঞ্চল বাংলার কাঠপুতুল শিল্পের প্রধান কেন্দ্র। এখানকার কারিগররা বংশ পরম্পরায় কাঠের পুতুল তৈরি করে আসছেন। ঐতিহ্যগতভাবে এই পুতুলগুলি দেশীয় বাজারে বিক্রি হলেও, এখন তা আন্তর্জাতিক বাজারে বিশেষত ব্রিটেনে ব্যাপক চাহিদা তৈরি করেছে।
ভারত-ব্রিটেন বাণিজ্যচুক্তির আগে, ব্রিটিশ বাজারে কাঠপুতুল রফতানির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য শুল্ক দিতে হত, যা পণ্যের দাম অনেক বাড়িয়ে দিত। এর ফলে স্থানীয় ক্ষুদ্র কারিগররা আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ করতে পারতেন না। কিন্তু শুল্কমুক্ত চুক্তির ফলে এখন আর সেই বাধা নেই। এর ফলস্বরূপ, ব্রিটিশ খুচরো বিক্রেতারা এখন সরাসরি বাংলার কারিগরদের কাছ থেকে কাঠপুতুল কিনতে পারছে, যা উভয় পক্ষের জন্যই লাভজনক।
এই চুক্তির ফলে সবচেয়ে বেশি উপকৃত হয়েছেন বাংলার কাঠপুতুল কারিগররা। নদীয়ার কৃষ্ণনগরের একজন প্রবীণ কারিগর, বলেন, “আমরা বছরের পর বছর ধরে পুতুল তৈরি করে আসছি। কিন্তু উপযুক্ত বাজারের অভাবে আমরা ভালো দাম পেতাম না। শুল্কমুক্ত চুক্তির পর থেকে বিদেশি ব্যবসায়ীরা আমাদের কাছে সরাসরি অর্ডার দিচ্ছে। এতে আমাদের পণ্য বিক্রির পরিমাণ বেড়েছে এবং আগের চেয়ে ভালো দাম পাচ্ছি।”
তিনি আরও জানান, “এখন আমরা শুধু দেশীয় থিম নয়, বরং ব্রিটিশ ক্রেতাদের রুচি অনুযায়ী নতুন নতুন নকশার পুতুলও তৈরি করছি। এতে আমাদের সৃজনশীলতারও সুযোগ হচ্ছে।” পশ্চিমবঙ্গ সরকার এবং কেন্দ্র সরকার এই চুক্তির সুফল পুরোপুরি কাজে লাগানোর জন্য একাধিক পদক্ষেপ নিয়েছে।
প্রশিক্ষণ: ক্ষুদ্র শিল্প উদ্যোক্তাদের আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা এবং পণ্যের গুণমান সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। অনলাইন প্ল্যাটফর্ম: অনলাইনে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সাথে সরাসরি যোগাযোগের জন্য বিভিন্ন ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা হয়েছে।
মেলা ও প্রদর্শনী: ব্রিটেনে ভারতীয় পণ্যের প্রদর্শনী এবং মেলায় বাংলার শিল্পীদের অংশগ্রহণের সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গের ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প উন্নয়ন নিগমের এক আধিকারিক জানান, “আমরা এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে রাজ্যের অন্যান্য ঐতিহ্যবাহী শিল্প, যেমন – ডোকরা শিল্প, টেরাকোটা শিল্প, কাঁথা স্টিচ ইত্যাদিকেও আন্তর্জাতিক বাজারে তুলে ধরার চেষ্টা করছি। এতে শুধু আর্থিক লাভ নয়, বরং আমাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিও বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়বে।”
ভারত-ব্রিটেন শুল্কমুক্ত বাণিজ্যচুক্তি বাংলার কাঠপুতুল শিল্পের জন্য এক আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। এই চুক্তির ফলে স্থানীয় কারিগরদের আয় বৃদ্ধি পাচ্ছে, তাদের পণ্যের চাহিদা বাড়ছে এবং বাংলার ঐতিহ্যবাহী শিল্প বিশ্ব মঞ্চে এক নতুন পরিচিতি পাচ্ছে। এই সাফল্য রাজ্যের অন্যান্য ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের জন্যও অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই চুক্তির সঠিক বাস্তবায়ন এবং সরকারের সহায়তায় বাংলার শিল্পীরা আন্তর্জাতিক বাজারে আরও সাফল্য অর্জন করতে পারবে বলে আশা করা যায়।
