পদক্ষেপের আহ্বান জানালেন অংশীজনরা

আইআইটি খড়গপুরের সমীক্ষায় দেখা গেছে, এনএইচ-১৬-এ গৃহীত হস্তক্ষেপের ফলে যানবাহনের পরিচালনগত গতি  সর্বোচ্চ ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে, যা সারা দেশে এই ধরনের পদক্ষেপ আরও বিস্তৃতভাবে বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয়তাকে জোরদার করেছে ২০২৪ সালে ভারতে সড়ক দুর্ঘটনায় ১.৮ লক্ষেরও বেশি মানুষের মৃত্যুর ঘটনা নথিভুক্ত হওয়ার প্রেক্ষাপটে, নীতিনির্ধারক, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, গবেষক এবং নাগরিক সমাজের নেতৃবৃন্দ আজ কলকাতায় একত্রিত হয়ে ২০৩০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু এবং গুরুতর আঘাতের সংখ্যা অর্ধেকে নামিয়ে আনার লক্ষ্যে জরুরি পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা করেন। আইআইটি খড়গপুর রিসার্চ পার্কে রোড সেফটি নেটওয়ার্ক(আরএসএন) -এর উদ্যোগে এবং আইআইটি খড়গপুরের সহযোগিতায় আয়োজিত এই উচ্চপর্যায়ের সংলাপে সরকারি আধিকারিক, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ক বিশেষজ্ঞরা অংশ নেন। সড়ক দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু এবং গুরুতর আঘাত কমাতে প্রমাণভিত্তিক  হস্তক্ষেপ নিয়ে তাঁরা আলোচনা করেন।

” পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে, “প্রমাণ-ভিত্তিক নীতিগত হস্তক্ষেপের মাধ্যমে সড়ক নিরাপত্তার অগ্রগতি” শীর্ষক প্লেনারি অধিবেশনে বক্তব্য রাখেন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের নগর উন্নয়ন ও পুর বিষয়ক দফতরের বিশেষ সচিব শ্রীমতি পাপিয়া ঘোষ রায় সেভলাইফ ফাউন্ডেশনের গৌতম সিং; পরিসার-এর রঞ্জিত গাড়গিল; বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডাবলুএইচও)-র ডঃ মহম্মদ আশীল; এবং সিটিজেন কনজিউমার অ্যান্ড সিভিক অ্যাকশন গ্রুপ (সিএজি)-এর এস. সরোজা তাঁদের মূল্যবান মতামত তুলে ধরেন অধিবেশনটি সঞ্চালনা করেন আইআইটি খড়গপুরের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক এবং রোড সেফটি নেটওয়ার্কের সদস্য অধ্যাপক ডঃ ভার্গব মৈত্র। তার সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত এই আলোচনায় তথ্য-ভিত্তিক নীতি, বৈজ্ঞানিক গতি ব্যবস্থাপনা, নিরাপদ নগর চলাচল এবং সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু ও গুরুতর আঘাত কমানোর লক্ষ্যে পদ্ধতিগত হস্তক্ষেপের মাধ্যমে সড়ক নিরাপত্তা জোরদার করার উপর আলোকপাত করা হয়।  আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল অতিরিক্ত গতি, যা এখনও ভারতে সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান  কারণ। সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক মন্ত্রকের (MoRTH) ভারতের সড়ক দুর্ঘটনা ২০২৪-এর সর্বশেষ রিপোর্ট অনুযায়ী, অতিরিক্ত গতির কারণে মোট সড়ক দুর্ঘটনার ৬২ শতাংশ ঘটেছে এবং সারা দেশে এক লক্ষেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। রিপোর্টে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, ঝুঁকিপূর্ণ পথ ব্যবহারকারীদের ওপর এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি। পথচারীদের মৃত্যু হয়েছে ৩৬,৫২৬ জনের, যা মোট সড়ক দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর ২০.৬ শতাংশ এবং দুই-চাকার যানবাহনের আরোহীদের (৪৬.২ শতাংশ)-এর পরেই দ্বিতীয় সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত শ্রেণি।

এই প্রেক্ষাপটে, অংশগ্রহণকারীরা পশ্চিমবঙ্গের বৈজ্ঞানিক গতি ব্যবস্থাপনা কাঠামোকে ভারতে প্রথম একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরেন। এই কাঠামোর মাধ্যমে সড়কের ব্যবহার, পার্শ্ববর্তী ভূমির ব্যবহার এবং ঝুঁকিপূর্ণ পথ ব্যবহারকারীদের নিরাপত্তার প্রয়োজন অনুযায়ী গতিসীমা নির্ধারণ করা হচ্ছে। পাশাপাশি নিরাপদ ব্যবস্থা-ভিত্তিক হস্তক্ষেপ, নিরাপদ নগর করিডর, প্রযুক্তিনির্ভর আইন প্রয়োগ, শিশু যাত্রী নিরাপত্তা এবং দীর্ঘমেয়াদি সড়ক নিরাপত্তা কর্মপরিকল্পনা নিয়েও আলোচনা হয়।

অনুষ্ঠানে আইআইটি খড়গপুর পশ্চিমবঙ্গের বালিহাটি থেকে কোলাঘাট পর্যন্ত এনএইচ-১৬-এর ৫১ কিলোমিটার অংশে পরিচালিত একটি সমীক্ষার ফলাফল উপস্থাপন করে। সমীক্ষায় দেখা গেছে, নকশাভিত্তিক গতিনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালুর ফলে গাড়ির চলাচলের গতি ৩৯-৪৫ শতাংশ, ভারী যানবাহনের গতি ২৯-৩৩ শতাংশ এবং দুই-চাকার যানবাহনের গতি ১৮-২৮ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। গবেষকরা আরও লক্ষ্য করেন, যেখানে এই ধরনের ব্যবস্থা কার্যকর করা হয়েছে সেখানে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা, মৃত্যুর সংখ্যা এবং দুর্ঘটনার তীব্রতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এই ফলাফল বৈজ্ঞানিক গতিনিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে প্রাণহানির ঝুঁকি কমানোর গুরুত্বকে আরও জোরদার করে। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের নগর উন্নয়ন ও পুর বিষয়ক দফতরের বিশেষ সচিব শ্রীমতি পাপিয়া ঘোষ রায় চৌধুরী বলেন, ” সেফ করিডোর  উদ্যোগটি দেখায় যে, নিরাপদ গতি, সড়ক প্রকৌশল, আইন প্রয়োগ এবং পথচারীবান্ধব পরিকাঠামোর মতো সমন্বিত পদপে কীভাবে প্রাণহানির ঝুঁকি কমাতে পারে। আমাদের প্রচেষ্টা নিরাপদ চলাচল পরিবেশ তৈরিতে নিবদ্ধ, বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক ব্যবহারকারীদের জন্য, এবং একই সাথে এমন একটি মডেল গড়ে তোলা যা পশ্চিমবঙ্গের শহরাঞ্চল জুড়ে অনুকরণ করা যেতে পারে।” আইআইটি খড়গপুরের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক এবং রোড সেফটি নেটওয়ার্কের সদস্য ভার্গব  মৈত্র বলেন, “বৈজ্ঞানিক গতিনিয়ন্ত্রণ কাঠামো গ্রহণের মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গ একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে। এখন মূল গুরুত্ব হওয়া উচিত বাস্তবায়নের ওপর- নীতিকে নিরাপদ করিডর, নিরাপদ গতি এবং প্রাণহানির পরিমাপযোগ্য হ্রাসে রূপান্তর করা। কলকাতার সাম্প্রতিক অগ্রগতি দেখিয়েছে যে প্রমাণভিত্তিক হস্তক্ষেপ মানুষের জীবন বাঁচাতে পারে। এখন সেই অভিজ্ঞতাকে পশ্চিমবঙ্গের অন্যান্য শহর ও জেলায় সম্প্রসারণ এবং বাস্তবায়ন করাই পরবর্তী বড় চ্যালেঞ্জ।” অংশগ্রহণকারীরা জোর দিয়ে বলেন, সড়ক দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু কমাতে হলে প্রয়োজন স্থানভিত্তিক উপযুক্ত গতিসীমা, নিরাপদ সড়ক নকশা, প্রযুক্তিনির্ভর আইন প্রয়োগ, উন্নত পথচারী পরিকাঠামো, আরও শক্তিশালী জরুরি চিকিৎসা পরিষেবা এবং পরিবহণ, নগর উন্নয়ন, পুলিশ, স্বাস্থ্য ও স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে অধিকতর সমন্বয়। কলকাতায় অনুষ্ঠিত এই সংলাপ থেকে উঠে আসা মতামত ও সুপারিশগুলি ভবিষ্যতে পশ্চিমবঙ্গ এবং দেশের অন্যান্য অঞ্চলে সড়ক নিরাপত্তা নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে সহায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে।