পশ্চিমবঙ্গে বাড়ছে ডায়াবেটিস ও মেটাবলিক সমস্যার বোঝা, সময়মতো পরীক্ষা করার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের

ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, স্থূলতা এবং কোলেস্টেরলের সমস্যা এখন অনেক ক্ষেত্রেই একসঙ্গে দেখা যাচ্ছে। তাই পশ্চিমবঙ্গের মানুষকে শুধু ডায়াবেটিসের দিকে নজর না দিয়ে সামগ্রিকভাবে মেটাবলিক স্বাস্থ্যের দিকে নজর দেওয়ার এবং সময় থাকতে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানোর পরামর্শ দিচ্ছেন চিকিৎসকরা। রাজ্যে এই উদ্বেগ আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ICMR-INDIAB-এর এক গবেষণা অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গের ১৩.৭% মানুষের ডায়াবেটিস রয়েছে এবং আরও ২৩.৫% মানুষ প্রি-ডায়াবেটিসে ভুগছেন। একই গবেষণায় দেখা গেছে, রাজ্যে ৪২.৪% মানুষের উচ্চ রক্তচাপ এবং ২৭% মানুষের কোলেস্টেরল বেশি[1]।

এর অর্থ হল, রাজ্যের একটি বড় অংশ হয় ইতিমধ্যেই ডায়াবেটিস নিয়ে জীবনযাপন করছেন, অথবা তাঁদের রক্তে শর্করার মাত্রা এমন পর্যায়ে রয়েছে, যেখান থেকে ভবিষ্যতে ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি বেশি। এই পরিস্থিতি মনে করিয়ে দেয় যে, ডায়াবেটিস ধরা পড়ার পর চিকিৎসা শুরু করার পাশাপাশি তার আগেই মেটাবলিক সমস্যাগুলির ঝুঁকি চিহ্নিত করা এবং সময়মতো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়াও জরুরি।

শুধু রাজ্যজুড়েই নয়, কলকাতার শহরাঞ্চলেও এই সমস্যার ছবি দেখা যাচ্ছে। কলকাতায় ১৮ থেকে ৪৯ বছর বয়সি ৩৮৮ জন প্রাপ্তবয়স্ককে নিয়ে করা একটি কমিউনিটি-ভিত্তিক গবেষণায় দেখা গেছে, ৪৪.৬% মানুষের মেটাবলিক সিনড্রোম রয়েছে। ৬৮.৬% মানুষের ক্ষেত্রে পেটের মেদ বা কেন্দ্রীয় স্থূলতা দেখা গেছে। এছাড়া ৪১.৫% মানুষের ফাস্টিং ব্লাড সুগার বেশি, ৪৫.১% মানুষের রক্তচাপ বেশি এবং ৬৪.৯% মানুষের HDL বা ‘ভালো’ কোলেস্টেরলের মাত্রা কম ছিল[2]।

ডাঃ গৌরব ভাদুড়ি, MD (Internal Medicine), SCE (Endocrinology & Diabetes UK), Lionel Opie Fellow (London UK), FICP, FDI, Senior Consultant: Diabetes & Endocrinology, Apollo Sugar Clinic, Kolkata, বলেন, “ডায়াবেটিস এবং প্রি-ডায়াবেটিসের বাড়তে থাকা সমস্যা আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, রোগের অনেক আগেই সতর্ক হওয়া দরকার। প্রি-ডায়াবেটিস এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়, যখন খাবারদাবারে পরিবর্তন, নিয়মিত শরীরচর্চা, ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করলে ডায়াবেটিস হওয়া অনেকটাই পিছিয়ে দেওয়া বা কখনও কখনও প্রতিরোধও করা সম্ভব। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়লেও অনেক সময় কোনও স্পষ্ট লক্ষণ দেখা যায় না। তাই নিয়মিত পরীক্ষা করা খুবই জরুরি, বিশেষ করে যাঁদের পরিবারে ডায়াবেটিসের ইতিহাস রয়েছে, ওজন বেশি, জীবনযাত্রা খুব একটা সক্রিয় নয় বা অন্য কোনও মেটাবলিক ঝুঁকি রয়েছে। তাই ডায়াবেটিস প্রতিরোধকে শুধু একজন ব্যক্তির দায়িত্ব হিসেবে দেখা উচিত নয়। এর জন্য সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো, আগে থেকেই ঝুঁকি চিহ্নিত করা এবং সমাজ ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার স্তরে ধারাবাহিকভাবে প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ নেওয়া দরকার।”

ডাঃ পি কে হাজরা, MD, DM, DNB, FACC, Head, Department of Cardiology এবং Director, Cardiac Cath Lab, Manipal Hospital Dhakuria, Kolkata, বলেন, “মেটাবলিক সমস্যার প্রভাব হৃদ্‌স্বাস্থ্যের উপরও পড়তে পারে। রক্তে শর্করা বেড়ে যাওয়া, পেটের মেদ, উচ্চ রক্তচাপ এবং কোলেস্টেরলের সমস্যা অনেক সময় একসঙ্গে দেখা যায়। এর ফলে হৃদ্‌রোগ এবং স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়তে পারে। কলকাতার এই গবেষণার ফলাফল দেখায়, কেন শুধু ডায়াবেটিসের দিকে নজর না দিয়ে মেটাবলিক স্বাস্থ্যকে সামগ্রিকভাবে দেখা দরকার। নিয়মিত রক্তে শর্করা, রক্তচাপ ও কোলেস্টেরল পরীক্ষা করা, ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং সক্রিয় জীবনযাপন করলে এই ঝুঁকিগুলি অনেকটা আগেই চিহ্নিত ও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। যাঁদের ডায়াবেটিস বা প্রি-ডায়াবেটিস রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে সময়মতো চিকিৎসা শুরু করা এবং নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া দীর্ঘমেয়াদে হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ।”

চিকিৎসকদের পরামর্শ, বিশেষ করে যাঁদের ডায়াবেটিস বা অন্যান্য মেটাবলিক সমস্যার ঝুঁকি রয়েছে, তাঁরা নিয়মিত রক্তে শর্করা, রক্তচাপ, কোলেস্টেরল এবং কোমরের মাপ পরীক্ষা করুন। এর পাশাপাশি নিয়মিত শরীরচর্চা করা, সক্রিয় জীবনযাপন এবং সুষম খাবার খাওয়াও জরুরি।